ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় আছে ৩০ হাজার বইয়ের ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার’। এসি পাঠাগারে আসে সানন্দা, ভারত বিচিত্রাও। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের চাঁদার টাকায় গড়া এই পাঠাগার।
বিরাট এই পাঠাগারটি আছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়। উপজেলার রেলস্টেশনের পাশে তিনতলা ইয়ংস্টার ক্লাব ভবনের নিচতলা জুড়ে আছে বিশাল এক পাঠাগার। নাম ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার’। পুরো পাঠাগারই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ২০১৭ সালে পাঠকরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরামে বই পড়তে পারেন সে জন্য পাঠাগার এসি করা হয়েছে। তাও মানুষের দানে করা।
ইয়ংস্টার ক্লাবের আজীবন সদস্য ও ঢাকা মিরপুরের দারুসসালাম থানার তদন্ত কর্মকর্তা এবং পার্বতীপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ফারুকুন আলম এসির খরচ দিয়েছেন। পাঠাগারে মোট ছয় হাজার বই আছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, দর্শন সবই আছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে আছে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘বাংলাদেশের গেরিলা যুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতনের দলিল’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত কথা’, ‘প্রাক-পলাশী বাংলা’, ‘মুর্শিদকুলি খা’, ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রমা’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি’, ‘পিতৃপুরুষের পাপ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ছবি’, ‘সবখানেই যুদ্ধ’, ‘ছেষট্টি দিনের স্বাধীনতা’, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-’, ‘বাংলাপিডিয়া’, ‘গণতন্ত্র বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা’, ‘বন্দুকের ছায়ায় গণতন্ত্র’, ‘আমার সময়’, ‘রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি’, ‘তিন কুড়ি দশ’, ‘সাজাহান’, ‘সেকালের স্মৃতি’, নজরুলের ‘দোলনচাপা’, ‘আব্বা হুজুরের দেশে’, ‘উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ’, ‘এমপির কারাদহন’, কাঁটাতারের প্রজাপতি, ‘আমার ভালবাসার দেশ’, ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘সময়ের আবর্তে’, ‘ক্রমাগত গহীনে যাত্রা’, ‘অলিম্পিক’, ‘রেনেসাঁস’, ‘দাবা খেলার আইনকানুন’, ‘ভাষা পরিক্রমা’, ‘ব্র্যাক : উন্নয়নের একটি উপাখ্যান’, বাংলা একাডেমির ‘সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান’, ‘শত মনীষীর কথা’, ‘রামায়ণ’, ‘জীবনপুর’, ‘লালন সংগীতে আত্মদর্শন’, ‘সেরা কিশোর গল্প’, ‘সুচয়নী’, ‘বিষাদসিন্ধু’, শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’, ‘বিভূতিভূষণ রচনাবলি’, রবীন্দ্রনাথের ‘উপন্যাস সমগ্র’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘উপন্যাস সমগ্র’, ডেল কার্নেগির ‘শ্রেষ্ঠ রচনা’। এখানে নিয়মিত ২০টি পত্রিকাও আসে। সেগুলোর অন্যতম দেশ রূপান্তর, কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, জনকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, নিউ নেশন। ম্যাগাজিন থাকে আনন্দলোক, সানন্দা, ভারত বিচিত্রা। বিশাল এই সংগ্রহশালায় ডুবে থাকতে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। তবে শুক্রবার বন্ধ। ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার’-এর সদস্য মোট ৭শ। প্রতিজন ছাত্র, ছাত্রী মাসিক ২২ টাকা চাঁদা দেন। অন্যেরা অনুদান দেন। বই ও পাঠাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন লাইব্রেরিয়ানও আছেন।
এই পাঠাগারের মূল প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’। এই ক্লাবের সভাপতি আমজাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যতম সদস্য হলেন আশিস কুমার সাহা, নজরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক বাদল, আরশেদ আলী, বেলাল হোসেন, আবদুল মজিদ, হাফিজুর রহমান, চাঁদ আলী, মামুনুর রশিদ মামুন। এই উপজেলার মোট ১১ জন যুবক মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে ক্লাবের জন্ম। তখন থেকে আজও তাদের লক্ষ্য বড় পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকার এ জনপদে শিক্ষা ও মানবতার বিকাশ ঘটানো। সেটিরই অংশ হিসেবে পাঠাগারের জন্ম ১৯৯৮ সালে। কেন এই পাঠাগার এই প্রশ্নের উত্তরে ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’ সভাপতি, স্থানীয় সমাজসেবী, ক্রীড়া সংগঠক এবং পাঠাগার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আমজাদ হোসেন বললেন, ‘আমাদের মতো গ্রামে বসবাস করা মানুষের ছেলেমেয়েরা শহরের ছেলেমেয়েদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকে। হাত বাড়ালেই তারা ভালো বইগুলো পেতে পারে না। এসব ছেলেমেয়েরা যেন পিছিয়ে না থাকে, চাইলেই বই পড়তে পারে, মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে, সেজন্য আমরা ইয়ংস্টার ক্লাব ভবনের নিচতলায় এই পাঠাগার, ওপরতলায় ললিতকলা একাডেমি এবং থিয়েটার গড়েছি। আমরা চাই, পাঠাগারে বই পড়ে ছাত্রছাত্রীদের মেধার বিকাশ ঘটুক।’
পাঠাগারের জন্মের গল্পটি অত্যন্ত মানবিক। সে গল্প বলতে গিয়ে ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার কমিটি’র সাধারণ নজরুল ইসলাম ফিরে গেলেন অতীতে, ‘তখন আমাদের পার্বতীপুরে কোনো পাঠাগারই ছিল না। ফলে এটির জন্ম। তবে পাঠাগারের শুরু এত সহজ ছিল না। একে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কেউ কেউ সারা মাসের পকেট খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়েছেন, কেউ টিউশনির টাকা থেকে আলাদা করে টাকা রেখেছেন। সবার জমানো টাকায় পাঠাগারের কাজ শুরু হয়েছে। এমনকি বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পাঠাগারে দিয়েছে।’
পাঠাগারের প্রাণ প্রতিষ্ঠার পর শুরু হলো বই সংগ্রহ। অনেকে বাড়ির বই উপহার দিয়েছেন। এভাবে পুরো উপজেলার মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতায় গণপাঠাগারটি দুই হাজার বইয়ের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ ও ১শ সদস্য নিয়ে যাত্রা করল। শুরু থেকেই বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ধীরে ধীরে পাঠাগারের নামটি ছড়িয়ে পড়ল। এলাকায়ও বইপড়ার প্রভাব পড়তে লাগল। পাঠাগারের সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনরা বইপড়ার গল্প শুনে বই দিতে লাগলেন। যেমন মতিউর রহমান দিয়েছেন প্যাপিরাস থেকে কেনা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আধুনিক ভারতীয় গল্প’, আবদুল খালেক দিয়েছেন আগামী থেকে প্রকাশিত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি’র ‘সামরিক জান্তার রাজনীতি’। এমন আরও অনেকে সাধারণ মানুষকে পড়তে ও এলাকার সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে বই দিয়েছেন। তাতে পাঠাগার সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে পার্বতীপুরের প্রবীণ, তরুণ ও আগ্রহী সংবাদপত্র পাঠকরা পাঠাগারে পত্রিকার খুব অভাববোধ করলেন। নিয়মিত পাঠকদের জন্য তাই কদিন পরেই পত্রিকা রাখা শুরু হলো। এখন তো অনেক পত্রিকাই আছে। জাতীয় দৈনিক আছে। আঞ্চলিক পত্রিকাও আছে। ২১ বছর ধরে দিনাজপুর, রংপুরের ‘আজকের প্রত্যাশা’, ‘দেশবার্তা’, ‘উত্তরা’, ‘জনমত’, ‘আমাদের প্রতিদিন’, ‘যুগের আলো’, ‘মানববার্তা’সহ বেশকটি পত্রিকা ক্লাবের ঠিকানা প্রগতি সংঘ, পার্বতীপুর, দিনাজপুরে কুরিয়ারে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ১৯৯৮ সালে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পাঠাগারে যুক্ত আছে। তারা আজও বই দিয়ে সাহায্য করছেন। সবার ভালোবাসায় এভাবে পাঠাগার সমৃদ্ধ হচ্ছে।
পাঠাগারের অনেক পাঠক, সব বয়সের পাঠক। শিশুদের জন্য আলাদা সেলফ আছে। অনামিকা জয়ত্রী এলাকার সূর্যমুখী কিন্ডারগার্টেন স্কুলে কেজি টুতে পড়ে। অনামিকা বলল, “পাঠাগারের শিশুদের সব বই-ই পড়ে ফেলেছি। ‘ঠাকুমার ঝুলি’ খুব ভালো লেগেছে। এমন আরও অনেক বই চাই।” আরেক ছোট্ট পাঠক মুজিবাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির ছাত্র মাহিম জানাল, ‘আমাদের পাঠাগারের ছড়ার বই, কিশোর গল্প ও নানা ধরনের গল্পের বই পড়তে ভালো লাগে।’
সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে মাইশা আরফিন মুনা। সে বলল, ‘ফেইসবুক, ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে এই পাঠাগারের পুরনো বইগুলোর মধ্যে অনেক বেশি আনন্দ আছে। সময় পেলেই তাই ছুটে আসি।’ সরকারি বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুবর্ণা আকতার স্মৃতি বলল, “আমি এখানে গল্প, ছড়ার বই পড়তে আসি। ‘আমার ভালবাসার দেশ’ খুব ভালো লেগেছে। পত্রিকাগুলো পড়ে দেশ-বিদেশের খবর জানতে পারছি, জ্ঞান বাড়ছে।” আরেক সদস্য ২৯ বছরের মেরাজুল ইসলাম তারেক। তিনি প্রতি বিকেলে পত্রিকা পড়তে আসেন। জ্ঞানলাভের পাশাপাশি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গেও তখন নানা বিষয়ে আলাপ করেন। তাদের অন্যতম দিনাজপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২’র পার্বতীপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম (ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার) মজিবুল হক। তিনিও পাঠাগারের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় উপকৃত হয়েছেন, “এই পাঠাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বইগুলো পড়ে ভালো লেগেছে। এখন পড়ছি কামাল লোহানীর ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’।” ৩০ হাজার বইয়ের এই সমৃদ্ধ পাঠাগারের সমস্যাও আছে। ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’ সভাপতি বললেন, ‘পাঠাগারে আরও সেলফ ও বই প্রয়োজন।’
বিরাট এই পাঠাগারটি আছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়। উপজেলার রেলস্টেশনের পাশে তিনতলা ইয়ংস্টার ক্লাব ভবনের নিচতলা জুড়ে আছে বিশাল এক পাঠাগার। নাম ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার’। পুরো পাঠাগারই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ২০১৭ সালে পাঠকরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরামে বই পড়তে পারেন সে জন্য পাঠাগার এসি করা হয়েছে। তাও মানুষের দানে করা।
ইয়ংস্টার ক্লাবের আজীবন সদস্য ও ঢাকা মিরপুরের দারুসসালাম থানার তদন্ত কর্মকর্তা এবং পার্বতীপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ফারুকুন আলম এসির খরচ দিয়েছেন। পাঠাগারে মোট ছয় হাজার বই আছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, দর্শন সবই আছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে আছে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘বাংলাদেশের গেরিলা যুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতনের দলিল’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত কথা’, ‘প্রাক-পলাশী বাংলা’, ‘মুর্শিদকুলি খা’, ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রমা’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি’, ‘পিতৃপুরুষের পাপ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ছবি’, ‘সবখানেই যুদ্ধ’, ‘ছেষট্টি দিনের স্বাধীনতা’, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-’, ‘বাংলাপিডিয়া’, ‘গণতন্ত্র বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা’, ‘বন্দুকের ছায়ায় গণতন্ত্র’, ‘আমার সময়’, ‘রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি’, ‘তিন কুড়ি দশ’, ‘সাজাহান’, ‘সেকালের স্মৃতি’, নজরুলের ‘দোলনচাপা’, ‘আব্বা হুজুরের দেশে’, ‘উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ’, ‘এমপির কারাদহন’, কাঁটাতারের প্রজাপতি, ‘আমার ভালবাসার দেশ’, ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘সময়ের আবর্তে’, ‘ক্রমাগত গহীনে যাত্রা’, ‘অলিম্পিক’, ‘রেনেসাঁস’, ‘দাবা খেলার আইনকানুন’, ‘ভাষা পরিক্রমা’, ‘ব্র্যাক : উন্নয়নের একটি উপাখ্যান’, বাংলা একাডেমির ‘সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান’, ‘শত মনীষীর কথা’, ‘রামায়ণ’, ‘জীবনপুর’, ‘লালন সংগীতে আত্মদর্শন’, ‘সেরা কিশোর গল্প’, ‘সুচয়নী’, ‘বিষাদসিন্ধু’, শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’, ‘বিভূতিভূষণ রচনাবলি’, রবীন্দ্রনাথের ‘উপন্যাস সমগ্র’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘উপন্যাস সমগ্র’, ডেল কার্নেগির ‘শ্রেষ্ঠ রচনা’। এখানে নিয়মিত ২০টি পত্রিকাও আসে। সেগুলোর অন্যতম দেশ রূপান্তর, কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, জনকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, নিউ নেশন। ম্যাগাজিন থাকে আনন্দলোক, সানন্দা, ভারত বিচিত্রা। বিশাল এই সংগ্রহশালায় ডুবে থাকতে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। তবে শুক্রবার বন্ধ। ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার’-এর সদস্য মোট ৭শ। প্রতিজন ছাত্র, ছাত্রী মাসিক ২২ টাকা চাঁদা দেন। অন্যেরা অনুদান দেন। বই ও পাঠাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন লাইব্রেরিয়ানও আছেন।
এই পাঠাগারের মূল প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’। এই ক্লাবের সভাপতি আমজাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যতম সদস্য হলেন আশিস কুমার সাহা, নজরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক বাদল, আরশেদ আলী, বেলাল হোসেন, আবদুল মজিদ, হাফিজুর রহমান, চাঁদ আলী, মামুনুর রশিদ মামুন। এই উপজেলার মোট ১১ জন যুবক মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে ক্লাবের জন্ম। তখন থেকে আজও তাদের লক্ষ্য বড় পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকার এ জনপদে শিক্ষা ও মানবতার বিকাশ ঘটানো। সেটিরই অংশ হিসেবে পাঠাগারের জন্ম ১৯৯৮ সালে। কেন এই পাঠাগার এই প্রশ্নের উত্তরে ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’ সভাপতি, স্থানীয় সমাজসেবী, ক্রীড়া সংগঠক এবং পাঠাগার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আমজাদ হোসেন বললেন, ‘আমাদের মতো গ্রামে বসবাস করা মানুষের ছেলেমেয়েরা শহরের ছেলেমেয়েদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকে। হাত বাড়ালেই তারা ভালো বইগুলো পেতে পারে না। এসব ছেলেমেয়েরা যেন পিছিয়ে না থাকে, চাইলেই বই পড়তে পারে, মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে, সেজন্য আমরা ইয়ংস্টার ক্লাব ভবনের নিচতলায় এই পাঠাগার, ওপরতলায় ললিতকলা একাডেমি এবং থিয়েটার গড়েছি। আমরা চাই, পাঠাগারে বই পড়ে ছাত্রছাত্রীদের মেধার বিকাশ ঘটুক।’
পাঠাগারের জন্মের গল্পটি অত্যন্ত মানবিক। সে গল্প বলতে গিয়ে ‘ইয়ংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার কমিটি’র সাধারণ নজরুল ইসলাম ফিরে গেলেন অতীতে, ‘তখন আমাদের পার্বতীপুরে কোনো পাঠাগারই ছিল না। ফলে এটির জন্ম। তবে পাঠাগারের শুরু এত সহজ ছিল না। একে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কেউ কেউ সারা মাসের পকেট খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়েছেন, কেউ টিউশনির টাকা থেকে আলাদা করে টাকা রেখেছেন। সবার জমানো টাকায় পাঠাগারের কাজ শুরু হয়েছে। এমনকি বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পাঠাগারে দিয়েছে।’
পাঠাগারের প্রাণ প্রতিষ্ঠার পর শুরু হলো বই সংগ্রহ। অনেকে বাড়ির বই উপহার দিয়েছেন। এভাবে পুরো উপজেলার মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতায় গণপাঠাগারটি দুই হাজার বইয়ের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ ও ১শ সদস্য নিয়ে যাত্রা করল। শুরু থেকেই বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ধীরে ধীরে পাঠাগারের নামটি ছড়িয়ে পড়ল। এলাকায়ও বইপড়ার প্রভাব পড়তে লাগল। পাঠাগারের সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনরা বইপড়ার গল্প শুনে বই দিতে লাগলেন। যেমন মতিউর রহমান দিয়েছেন প্যাপিরাস থেকে কেনা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আধুনিক ভারতীয় গল্প’, আবদুল খালেক দিয়েছেন আগামী থেকে প্রকাশিত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি’র ‘সামরিক জান্তার রাজনীতি’। এমন আরও অনেকে সাধারণ মানুষকে পড়তে ও এলাকার সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে বই দিয়েছেন। তাতে পাঠাগার সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে পার্বতীপুরের প্রবীণ, তরুণ ও আগ্রহী সংবাদপত্র পাঠকরা পাঠাগারে পত্রিকার খুব অভাববোধ করলেন। নিয়মিত পাঠকদের জন্য তাই কদিন পরেই পত্রিকা রাখা শুরু হলো। এখন তো অনেক পত্রিকাই আছে। জাতীয় দৈনিক আছে। আঞ্চলিক পত্রিকাও আছে। ২১ বছর ধরে দিনাজপুর, রংপুরের ‘আজকের প্রত্যাশা’, ‘দেশবার্তা’, ‘উত্তরা’, ‘জনমত’, ‘আমাদের প্রতিদিন’, ‘যুগের আলো’, ‘মানববার্তা’সহ বেশকটি পত্রিকা ক্লাবের ঠিকানা প্রগতি সংঘ, পার্বতীপুর, দিনাজপুরে কুরিয়ারে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ১৯৯৮ সালে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পাঠাগারে যুক্ত আছে। তারা আজও বই দিয়ে সাহায্য করছেন। সবার ভালোবাসায় এভাবে পাঠাগার সমৃদ্ধ হচ্ছে।
পাঠাগারের অনেক পাঠক, সব বয়সের পাঠক। শিশুদের জন্য আলাদা সেলফ আছে। অনামিকা জয়ত্রী এলাকার সূর্যমুখী কিন্ডারগার্টেন স্কুলে কেজি টুতে পড়ে। অনামিকা বলল, “পাঠাগারের শিশুদের সব বই-ই পড়ে ফেলেছি। ‘ঠাকুমার ঝুলি’ খুব ভালো লেগেছে। এমন আরও অনেক বই চাই।” আরেক ছোট্ট পাঠক মুজিবাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির ছাত্র মাহিম জানাল, ‘আমাদের পাঠাগারের ছড়ার বই, কিশোর গল্প ও নানা ধরনের গল্পের বই পড়তে ভালো লাগে।’
সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে মাইশা আরফিন মুনা। সে বলল, ‘ফেইসবুক, ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে এই পাঠাগারের পুরনো বইগুলোর মধ্যে অনেক বেশি আনন্দ আছে। সময় পেলেই তাই ছুটে আসি।’ সরকারি বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুবর্ণা আকতার স্মৃতি বলল, “আমি এখানে গল্প, ছড়ার বই পড়তে আসি। ‘আমার ভালবাসার দেশ’ খুব ভালো লেগেছে। পত্রিকাগুলো পড়ে দেশ-বিদেশের খবর জানতে পারছি, জ্ঞান বাড়ছে।” আরেক সদস্য ২৯ বছরের মেরাজুল ইসলাম তারেক। তিনি প্রতি বিকেলে পত্রিকা পড়তে আসেন। জ্ঞানলাভের পাশাপাশি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গেও তখন নানা বিষয়ে আলাপ করেন। তাদের অন্যতম দিনাজপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২’র পার্বতীপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম (ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার) মজিবুল হক। তিনিও পাঠাগারের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় উপকৃত হয়েছেন, “এই পাঠাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বইগুলো পড়ে ভালো লেগেছে। এখন পড়ছি কামাল লোহানীর ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’।” ৩০ হাজার বইয়ের এই সমৃদ্ধ পাঠাগারের সমস্যাও আছে। ‘ইয়ংস্টার ক্লাব’ সভাপতি বললেন, ‘পাঠাগারে আরও সেলফ ও বই প্রয়োজন।’
This a very good collection about library.
ReplyDelete