ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে সংগৃহীত
ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার
ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার হলো এমন কোন বাহন (সাধারণত বাস) যা
গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাহনগুলো বিশেষভাবে প্রস্তুত করা বইয়ের
তাক থাকে, যাতে কোন স্থানে যানটি দাঁড়ালে সেখানকার বাসিন্দারা সহজেই
তাঁদের পছন্দের বইগুলিকে খুঁজে নিতে পারেন। ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের
মাধ্যমে গ্রামে কিংবা শহরের বিভিন্ন স্থানে গ্রন্থাগারের সেবা পৌঁছানো হয়।
এই গ্রন্থাগারের মাধ্যমে সেই সমস্ত মানুষদের সেবা পৌছোন যায়, যারা
শারীরিক ভাবে অক্ষম হওয়ার কারণে গ্রন্থাগারে পৌছতে পারেন না। এই সমস্ত
গ্রন্থাগারে সাধারণতঃ কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ই-বই বা অডিও বই বিতরণ করা হয়ে থাকে।
খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে ইরানে সাহিব ইসমাইল ইবনে আব্বাদ (৯৩৬
খ্রিস্টাব্দ/ ৩২৬ হিজরী-৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ/ ৩৮৫ হিজরী) নামক ব্যক্তির কথা
ইতিহাসে পাওয়া যায়। তিনি অধ্যয়নপ্রিয় মানুষ ছিলেন। কোথাও সফরে বের হলে
সাথে উট ও ঘোড়ায় কিতাব সাজিয়ে গ্রন্থাগার বানিয়ে তারপর বের হতেন। কখনো
কখনো এর সংখ্যা দাঁড়াতো ৩০ উট কখনো ৪০ উট। নিজে ভ্রমণকালে অধ্যয়ন করতেন।
তার ছাত্ররাও বিভিন্ন সময় এই পাঠাগার থেকে উপকৃত হতো। কেউ কেউ তাকে
ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের আবিষ্কারক বলেছেন।
১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে দ্য ব্রিটিশ ওয়ার্কম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হয় যে, ইংল্যান্ডের কুম্ব্রিয়া অঞ্চলের আটটি গ্রামে একটি ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার
ক্রিয়াশীল অবস্থায় রয়েছে। জর্জ মুর নামক একজন সমাজসেবী ব্যবসায়ী ভালো
ভালো সাহিত্যকর্মকে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই
প্রকল্পের সৃষ্টি করেন। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ওয়ারিংটন প্যারাম্বুলেটিং লাইব্রেরী
ইংল্যান্ডের অপর একটি প্রাচীন ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের উদহারণ। ওয়ারিংটন
মেকানিক'স ইনস্টিটিউট দ্বারা পরিচালিত ঘোড়ায় টানা এই ভ্রাম্যমাণ
গ্রন্থাগারের মাধ্যমে স্থানীয় উৎসাহী মানুষদের বই ধার দেওয়া হত।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাউথ ক্যারোলিনয় পিপল'স ফ্রী লাইব্রেরী অফ চেষ্টার কাউন্টি নামক খচ্চর বাহিত একটি ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়। মেরী লেমিষ্ট টিটকম্ব
(১৮৫৭-১৯৩২) নামক ওয়াশিংটন কাউন্টি ফ্রি লাইব্রেরীর এক গ্রন্থাগারিক যখন
উপলব্ধি করেন যে তাঁর গ্রন্থাগারের বইগুলি এলাকার সমস্ত মানুষের কাছে পৌছতে
ব্যর্থ হচ্ছে, তিনি ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার চালু করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের নিকট বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সারাহ বায়ার্ড আস্কিউ নামক এক প্রখ্যাত মার্কিন গ্রন্থাগারিক তাঁর ফোর্ড মডেল টি গাড়ীতে করে নিউ জার্সির গ্রামীণ এলাকাতে বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
বাংলাদেশে ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির প্রচলন বেশ পুরনো। ১৯৬৩ সালে
কিশোরগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার চালু করে। তবে বিশ্ব
সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের কার্যক্রম শুরুর হয় ১৭
ডিসেম্বর, ১৯৯৯ সালে। প্রথম দিকে কার্যক্রমটি ঢাকায় আরম্ভ হলেও আজ তা
বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায় বিস্তৃত হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার পরিষেবা বর্তমান যুগে বিভিন্ন গ্রন্থাগার,
বিদ্যালয়, সমাজসেবী সংগঠনদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু অত্যধিক
খরচ, উন্নত প্রযুক্তির অভাব, ব্যবহারিক জটিলতা প্রভৃতি কারণে অনেকে এই
পরিষেবার প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। অপরদিকে বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন
গ্রন্থাগার স্থাপনের চেয়ে এই পরিষেবা অনেক কম খরচে সম্ভব বলে বহু মানুষ
ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারকেই এখনো পছন্দ করে থাকেন। পরিবেশবান্ধব ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার পরিষেবার উদ্দেশ্যে বর্তমানে
সৌরশক্তিচালিত ও অপ্রচলিত শক্তিচালিত যানবাহন তৈরী করাও শুরু হয়েছে। ইন্টারনেট আর্কাইভ সংগঠন চাহিদার ভিত্তিতে কপিরাইটবিহীন পুস্তকগুলিকে ছাপিয়ে বিতরণ করার জন্য নিজস্ব ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের প্রচলন করেছে।
Comments
Post a Comment