বইপড়া আন্দোলন

বইপড়া আন্দোলন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে বেড়েছে পাঠাগার সংখ্যা, বইও প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর; তবে কমেছে পাঠক। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রন্থাগার বাড়লেও সেগুলোর আধুনিকায়ন হয়নি, লাগেনি প্রযুক্তির ছোঁয়া। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও নগণ্য। পাঠককে পাঠাগারমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা ঝিমিয়ে পড়ে। বিশিষ্টজনরা বলছেন, প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে গ্রন্থাগারগুলোকে আধুনিক করতে হবে, বইকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে, বই করতে হবে সহজলভ্য যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরির বিশাল সংগ্রহশালায় গুটিকয়েক পাঠক।

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় গণগ্রন্থাগার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। জ্ঞানের আলো ছড়াতে ব্যক্তি উদ্যোগে এগিয়ে আসে অনেকেই। ১৮৫১ সালে গড়ে ওঠে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি। এরপর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে গণগ্রন্থাগার। দেশে এখন ১০০ থেকে ১৬৬ বছরের পুরনো লাইব্রেরি আছে ৩৪টি। সেগুলো গড়ে উঠেছে ১৮৫১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে। বাংলায় সাংগঠনিকভাবে রাজনৈতিক চর্চা শুরু হলে গ্রন্থাগার আন্দোলনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ১৯২৪ সালে বেলগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ৩৯তম অধিবেশনে গণগ্রন্থাগার নিয়ে আলোচনা হয় এবং দেশের সর্বত্র গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। একই বছর অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত গ্রন্থাগার সম্মেলনের তৃতীয় সভায় প্রতিটি প্রদেশে গ্রন্থাগার সমিতি সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরের বছরই গড়ে ওঠে নিখিল বঙ্গ গ্রন্থাগার সমিতি। এভাবে জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চা, পত্রিকা পড়া, সমাজসেবা ও সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে সারা দেশেই গড়ে উঠেছে গণগ্রন্থাগার। একসময় শিক্ষিত-বিদ্বান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সরগরম থাকত পাঠাগারগুলো। কোনো কোনো এলাকার পাঠাগারকে কেন্দ্র করে হয়েছে সাহিত্য আন্দোলন, সমাজ উন্নয়ন। তবে সেই রমরমা অবস্থা এখন আর নেই। গ্রন্থাগার আন্দোলনেও মরিচা ধরেছে। আশির দশকে ছিল টেলিভিশন, ভিসিআর-ভিডিওর প্রভাব; এখন আরো যোগ হয়েছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন। তরুণ প্রজন্মের আজ আর লাইব্রেরিমুখী হওয়ার ফুসরত নেই। পাঠকের আনাগোনা কমে যাওয়ায় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে একসময় আলোর মশাল জ্বালানো একেকটি পাঠাগার।

তবে ব্যক্তিক্রমও কিছু আছে, কোথাও কোথাও গড়ে উঠছে নতুন নতুন পাঠাগার। বিশেষ করে পরিবেশ ভালো—এমন জায়গাগুলোতে পাঠক সমাবেশও আছে।

বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সিদ্দিক মনে করেন, মানুষ এখন বই পড়ে না—এ ধারণা ঠিক নয়। প্রতিবছর দেশে নতুন বইয়ের প্রকাশনা বাড়ছে, বাড়ছে বই বিক্রির সংখ্যাও। কিন্তু গ্রন্থাগারের পরিবেশের উন্নয়ন হয়নি, প্রযুক্তির সংযোগ ঘটেনি; এদিকে কারো নজরও নেই। সময়মতো খোলা হয় না অনেক গ্রন্থাগার। নতুন বইয়ের জোগান নেই, নেই পৃষ্ঠপোষকতা। এসব কারণে গ্রন্থাগারগুলো সরব নেই। পাঠাগারগুলোর পরিবেশ উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা হলে ঠিকই মানুষ বই ও পাঠাগারমুখী হবে।

‘আলোকিত মানুষ চাই’—এ স্লোগান নিয়ে বই পড়া আন্দোলন শুরু করা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মনে করেন, দেশে পাঠাগার গড়ে উঠলেও পাঠক শ্রেণি গড়ে ওঠেনি। এ কারণেই পাঠাগারগুলো চলছে না। তাই আগে পাঠাভ্যাস তৈরি করতে হবে, পাঠক তৈরি করতে হবে। তবেই ফের সরব হবে  পাঠাগার। তবে এখন সময়ও বদলে গেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, নানা সমস্যাও বেড়েছে। তাই বইকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার, সহজলভ্য করার বিষয়টিও ভাবতে হবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এখন শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে পাঠকের দোরগোড়ায় বই নিয়ে হাজির হচ্ছে।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মহানগর পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, বইয়ের পাঠক আগের মতো আর নেই। ডিজিটাল যুগ আসার পর জ্ঞান অন্বেষণ থেকে মানুষ সরে যাচ্ছে। একুশে বইমেলায় বিপুল উৎসাহ লক্ষ করা গেলেও বাস্তবে বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। চেষ্টা আছে, কিন্তু বইয়ের দিকে ফেরানো যাচ্ছে না। ইন্টারনেট, ফেসবুক নিয়ে সবাই ব্যস্ত; কেউ লাইব্রেরিমুখী হতে চায় না। তবে শেষ পর্যন্ত কিন্তু বইয়ের দিকেই আসতে হবে। না হলে প্রকৃত জ্ঞান অন্বেষণ হবে না। নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হবে না।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৯৬ সালের দিকে আমি যখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মহানগর পাঠাগারে যোগ দিই তখন এটি ওসমানী উদ্যানে ছিল। পাঠক চাহিদার কারণে ৯টা-৫টা ও ৫টা-৯টা পর্যন্ত দুই শিফটে পাঠাগার খোলা রাখতে হতো। গড়ে দেড় শ থেকে দুই শ জন পাঠকের সমাবেশ ঘটত। এখন পাঠক আছে হাতে গোনা কয়েকজন। তা-ও বেশির ভাগ আসে দৈনিক পত্রিকা পড়ার জন্য।’ তিনি মানুষকে বইমুখী করার জন্য গ্রন্থাগারগুলোতে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটানো, ডিজিটাইজ করা, পরিবেশ উন্নত করা, নতুন নতুন বই সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গ্রন্থাগারের সংখ্যা কত? : দেশে কী পরিমাণ গ্রন্থাগার আছে তার যথাযথ কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ ব্যাপারে কখনো কোনো জরিপ হয়নি। তবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বিভিন্ন সময়ে ‘বেসরকারি গ্রন্থাগার নির্দেশিকা’ প্রকাশ করে। ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে চারটি। এ নির্দেশিকা থেকে গ্রন্থাগারের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্রকাশিত নির্দেশিকায় এক হাজার ৬৫টি লাইব্রেরির তথ্য রয়েছে। ২০১১ সালেরটিতে রয়েছে এক হাজার ৪২টির তথ্য। ২০০৩ সালের নির্দেশিকায় এক হাজার ৭৯৭টি গ্রন্থাগারের তথ্য প্রকাশিত হয়। আর ১৯৯৫ সালে প্রথম নির্দেশিকায় প্রকাশিত হয় ৯৯১টি গ্রন্থাগারের তথ্য। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী,  দেশে গ্রন্থাগারের সংখ্যা বাড়েনি। তবে বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতির হিসাব অনুসারে দেশে এক হাজার ৯১১টি গণগ্রন্থাগার রয়েছে। গণগ্রন্থাগার সমিতি দেশের সব গণগ্রন্থাগারের তথ্যসংবলিত গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও নতুন করে নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্য দিতে পাঠাগারগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

গ্রন্থাগারের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা : গ্রন্থাগার দেখভালের জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠান আছে দুটি। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর দেশের ৭০টি সরকারি গ্রন্থাগারের দেখভাল করে থাকে। আর আছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। তারা দেখভাল করে বেসরকারি পাঠাগার। পাশাপাশি তারা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দু-তিনটি স্থানে বছরে একবার বইমেলার আয়োজন করে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে সরকার বার্ষিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এ জন্য গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) সরকারের বরাদ্দ ছিল আড়াই কোটি টাকা। এ টাকা দেশের ৮৫৩টি গ্রন্থাগারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬৬৮টি গ্রন্থাগার, ২০১৩-১৪ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৭১৯টি করে গ্রন্থাগারকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। সরকারি বার্ষিক অনুদান তিন ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয়। গত বছর জেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগার ৪০ হাজার, উপজেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগার ৩০ হাজার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রন্থাগার ২০ হাজার টাকা করে পেয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক টাকা চেকের মাধ্যমে এবং অর্ধেক টাকার বই গ্রন্থকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হয়।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, একটি কমিটির মাধ্যমে নির্বাচিত প্রায় পাঁচ হাজার বইয়ের মধ্য থেকে পছন্দের বই গ্রন্থাগারগুলো গ্রহণ করে থাকে। তাদের যাতায়াত খরচও দেওয়া হয়।

তবে বরাদ্দ সরকারি অনুদানকে খুবই অপ্রতুল বলে মনে করেন গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সিদ্দিক বলেন, যে দেশের জাতীয় বাজেট হয় তিন লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার, সেই দেশে গ্রন্থাগারের জন্য সরকারের বরাদ্দ হচ্ছে মাত্র আড়াই কোটি টাকা! এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! অথচ মননশীল সমাজ গঠন করতে, তরুণ সমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন অপতৎপরতা থেকে মুক্ত রাখতে চাইলে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।

বেসরকারি গ্রন্থাগারের অর্থ লোপাট : বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে সরকার নামমাত্র অনুদান বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এই অর্থ একটি গ্রন্থাগারের বার্ষিক ব্যয়ের অতি সমান্য। অথচ সেই অনুদানের টাকা নিয়েও চলছে লুটপাট। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যে ৬৬৮টি গ্রন্থাগারকে অনুদান দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ৭৯টি শুধু নগদ অর্থ নিয়েছে, বই সংগ্রহ করেনি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শুধু নগদ টাকা নিয়েছে, কিন্তু বই সংগ্রহ করেনি ৮৪টি প্রতিষ্ঠান। যারা অনুদানের টাকা নেয়, কিন্তু বই নিতে আসে না সেগুলো গ্রন্থাগারের নামে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। তাদের বই দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হলেও চিঠি ফেরত আসে। তা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রায় প্রতিবছরই অনুদান দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আখতারুজ্জানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

আবার সরকারের অনুদানের যে অর্ধেক টাকা চেকের মাধ্যমে দেওয়া হয় তা তুলতে গিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের। যে গ্রন্থাগারের জন্য ২০ হাজার টাকা অনুদান বরাদ্দ হয়, সেটি নগদ অর্থ বরাদ্দ পায় ১০ হাজার টাকা। এ টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তা তুলতে গিয়ে টাকার ভাগ দিতে হয় উপজেলা কর্মকর্তার দপ্তরে। এ অভিজ্ঞতা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় সব লাইব্রেরিয়ানের। এ কারণে বাংলাদেশ গ্রন্থসুহৃদ সমিতি ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মতো ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে, যাতে সরাসরি গ্রন্থাগারের ব্যাংক হিসাবে অনুদানের টাকা চলে যায়।
বাংলাদেশ গ্রন্থসুহৃদ সমিতির সভাপতি এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “সারা দেশে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সরকারি অনুদানের টাকা তুলতে গিয়ে অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছে। অনুদান-হয়রানি বন্ধে আমরা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ চালু করার দাবি জানিয়েছিলাম।”

গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই : ১৯৯৮ সালে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন করে। এ নীতিতে গ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক ক্রমান্বয়ে গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার সুপারিশ করা হয়, যাতে যেকোনো নাগরিক তাঁর বাসস্থানের এক মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে একটি গণগ্রন্থাগার বা তার একটি শাখা কিংবা একটি চলমান শাখা থেকে গ্রন্থাগার পরিষেবা পেতে পারে। গ্রন্থনীতি বাস্তবায়ন ও গ্রন্থাগার সম্প্রসারণে কোন মন্ত্রণালয় কী কাজ করবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা ওই নীতির সুপারিশে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু গেল ১৮ বছরে এ নিয়ে আর কোনো কাজ হয়নি। এর মধ্যে ই-গ্রন্থ প্রকাশনা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু গ্রন্থনীতি সময়োপযোগীও করা হয়নি।

২০০৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে জেলা পাবলিক লাইব্রেরির বাইরে উপজেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র দুটি। সেগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জে। জাতীয় গ্রন্থনীতিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও জেলা গ্রন্থাগারের বাইরে আর কোনো গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরকারি গণগ্রন্থাগার জেলা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, সময়সূচি বাধা? : স্বাধীনতার পর জেলা পর্যায়ে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। সরকারের গ্রন্থাগার সুবিধা জেলা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই পাকা দালানকোঠা হয়েছে। বাকি ছয়টির স্থাপনা নির্মাণকাজ চলছে। আছে স্থায়ী জনবল। কিন্তু জেলা গণগ্রন্থাগারগুলোতে বইয়ের পাঠক কমে গেছে। যারা যায় তারা মূলত দৈনিক পত্রিকাই নাড়াচাড়া করে।

শেরপুর জেলা গণগ্রন্থাগারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে এ গ্রন্থাগারে প্রতিদিন ২০০-২৫০ জন পাঠক আসত। এখন ৬০-৭০ জনের বেশি পাঠক আসে না। যারা আসে তাদের বেশির ভাগই মূলত পত্রিকা পড়ে।

জেলা গণগ্রন্থাগারগুলো পাঠক ধরে রাখতে না পারার আরেকটি কারণ হচ্ছে সময়সূচি। গণগ্রন্থাগারগুলো খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। চাকরিজীবীরা অবসর সময়টি লাইব্রেরিতে কাটাতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না। পাঠাগার আন্দোলনে সক্রিয় শেরপুরের সাংবাদিক হাকিম বাবুল বলেন, লাইব্রেরিতে পাঠক সমাগমের জন্য খোলা রাখা উচিত বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেক দেন-দরবার করেও এটি সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি কাম মিলনায়তন হারিয়ে গেছে : সরকারি উদ্যোগে উপজেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি কাম মিলনায়তন নির্মাণ করা হয় আশির দশকের দিকে। সারা দেশে একই ডিজাইনে মিলনায়তন নির্মাণ করে তার পাশেই একটি কক্ষে লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়। দেওয়া হয় পর্যাপ্ত বই। কিন্তু লাইব্রেরির জন্য কোনো লাইব্রেরিয়ান দেওয়া হয়নি। ফলে এই লাইব্রেরিগুলো কার্যকর হয়নি।
গ্রন্থসুহৃদ সমিতি গঠনের উদ্যোগ : দেশে পাঠাগার আন্দোলনকে জোরদার করতে সারা দেশে গ্রন্থসুহৃদ সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। ফজলে রাব্বী পরিচালক থাকাকালে ১৯৭৮ সালে ‘নিজে বই পড়ব, অন্যকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করব’—এই চেতনা নিয়ে শুরু হয় এ প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেওয়া হতো। এর আওতায় সমিতিগুলোকে নতুন বই দেওয়া হতো। আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহের জন্য দেওয়া হতো এক হাজার করে টাকা। সমিতিগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, রচনা প্রতিযোগিতা, সাহিত্য আসর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাঠচক্র, জরিপ ইত্যাদি কার্যক্রমও পরিচালিত হতো। তবে ১৯৯১ সালের পর এর কার্যক্রম হারিয়ে গেছে।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মকর্তা মানিক মাহমুদ শুরু থেকে এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন তেমন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর বড়ই অভাব। সবাই বৈষয়িক হয়ে গেছি। বই পড়া কিংবা পড়ানোর সময় কোথায়? এই কর্মসূচির আওতায় ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এক হাজার ১৫২টি সমিতি গড়ে উঠেছিল এবং ১২ হাজার ৭৪৭ জন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’

৩০টি লাইব্রেরি আধুনিকায়ন হবে : সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের ৩০টি লাইব্রেরি আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় আধুনিকায়ন করা হবে। এ জন্য গত আগস্টে গ্রন্থাগার অধিদপ্তর ব্রিটিশ কাউন্সিলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। প্রকল্পটির আওতায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার অর্থায়নে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের ৩০টি লাইব্রেরিকে আধুনিকায়ন তথা ডিজিটাল ও ই-লাইব্রেরিতে রূপান্তর করা হবে।

এ বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘লাইব্রেরি আলোকিত মানুষ তৈরি করে। তরুণ প্রজন্মকে যদি আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলি তাহলে সে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। এ জন্য তাদের লাইব্রেরিমুখী করে তুলতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরিগুলোও পিছিয়ে নেই। কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের লাইব্রেরিগুলোকে ডিজিটাল ও ই-গ্রন্থাগার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা ই-গ্রন্থাগার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন লাইব্রেরিগুলোয় পাঠকসংখ্যা বাড়বে, তেমনি পাঠকদের কাছে লাইব্রেরিকে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।’

চলছে নানামুখী উদ্যোগ, সুদিনের প্রত্যাশা : দেশে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও মানুষকে বইমুখী করতে চলছে নানা উদ্যোগ। তবে এগুলো মূলত ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগে।

বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ২৫০টি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির কার্যক্রম নিয়েছে। এর বাইরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি দেশের ছয় হাজারটি লোকালয়ে সপ্তাহে একবার করে বই নিয়ে পাঠকের দরজায় যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকও সারা দেশে গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছে। সংস্থাটি প্রায় আট হাজার গ্রন্থাগার পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।

বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতি সারা দেশে গ্রন্থাগারগুলোকে সচল ও বেগবান রাখার জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশ গ্রন্থসুহৃদ সমিতি ‘পারিবারিক গ্রন্থাগার আলোকিত পরিবারের প্রতিচ্ছবি’ স্লোগান নিয়ে গ্রন্থপ্রেমীদের সংগঠিত করার কাজ করছে। এ সংগঠনের উদ্যোগে রাজধানীর উপকণ্ঠ বেরাইদ গ্রামে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছে ২০০১ সালে। এ গ্রন্থাগারের উদ্যোগে ওই গ্রামের কয়েকটি বিদ্যালয়ের ক্লাস রুটিনে লাইব্রেরি ঘণ্টা চালু করা হয়েছে। সংগঠনের উদ্যোগে গত বছর বেরাইদ মুসলিম হাই স্কুল মাঠে দুই দিনের বইমেলা ও গ্রন্থসুহৃদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ওই সম্মেলন থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হচ্ছে দেশের বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো করে এমপিওভুক্ত করা, অনুদান হয়রানি বন্ধে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ চালু করা ও অনুদান কমিটিতে গ্রন্থসুহৃদ সমিতির প্রতিনিধি রাখা।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে বই পড়ার আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার অনন্য উদাহরণ সৃৃষ্টি করেছেন পলান সরকার। হেঁটে রাজশাহীর ২০টি গ্রামে ঘরে ঘরে বই তুলে দিয়ে পেয়েছেন একুশে পদক। এ রকম আরো অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ গ্রন্থাগার ও বই পড়ায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন।

সম্ভাবনার ক্ষেত্র শিক্ষাঙ্গন, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির সূতিকাগার : মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে লাইব্রেরি থাকা বাধ্যতামূলক। সে হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি আছে কয়েক হাজার। কিন্তু সেগুলোয় লাইব্রেরিয়ানের কোনো পদ নেই। আবার যেগুলোয় লাইব্রেরিয়ান আছেন, সেগুলোতে লাইব্রেরিয়ান কিংবা সহকারী লাইব্রেরিয়ানরা লাইব্রেরিতে সময় না দিয়ে দাপ্তরিক কিংবা পাঠদানেই সময় কাটান।

আশার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রুটিনে লাইব্রেরি ঘণ্টা যুক্ত করার নির্দেশনা জারি করেছে। প্রতিটি শ্রেণিতে সপ্তাহে একটি ক্লাস থাকবে বই পড়ার জন্য।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

রাজশাহী বিভাগ নিবন্ধনকৃত বেসরকারী গ্রন্থাগারের তালিকা -১

বরিশাল জেলার গ্রন্থাগারের তালিকা

পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা