বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘর
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর
মুক্তিযুদ্ধের
বীর সোনালী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জাতীয় সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন
সোনাইমুড়ীবাসীর গর্বের ধন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিন। তাঁর নামে
গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর বিগত ২০ জুলাই ২০০৮ সালে স্থাপন করা হয় তার নিজ
গ্রামে। নোয়াখালী জেলা সদরথেকে ২৫ কিঃমিঃ উত্তর এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার সদর
থেকে ৮ কিঃমিঃ পশ্চিমে দেওটি ইউনিয়নভুক্ত বর্তমান রুহুল আমিন নগর
(বাগপাচরা) গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিনের পৈত্রিক ভূমিতে
নির্মাণ করা হয় এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতিজাদুঘর। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল
আমিনের পরিবারের সদস্যগণ কর্তৃকদানকৃত ০.২০ একর ভূমিতে ৬২.৯০ (বাষট্টি লক্ষ
নববই হাজার টাকা) ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুযোগ- সুবিধা সম্বলিত এ
গ্রন্থাগার ও স্মৃতিজাদুঘর। এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে একটি সুপরিসর
এবং সু-সজ্জিত পাঠ-কক্ষ ছাড়াও অভ্যর্থনা কক্ষ, তত্ত্ববধায়ক ওলাইব্রেরিয়ানের
জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন এর জীবনবৃত্তান্ত
বীরশ্রেষ্ঠ
রুহুল আমিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের জুন মাসের কোনো এক বর্ষণমুখর রাতে নোয়াখালীর
বাঘচাপড়া গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি ছিলেন মোটামুটি স্বচ্ছল
গৃহস্থ এবং মাতা জোলেখা খাতুন ছিলেন গৃহিণী।
ছোটবেলায় তার পড়াশোনা শুরু হয় পাড়ার মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে, পরে
বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুলে। স্কুল পাশ করে ভর্তি হন আমিষা পাড়া হাইস্কুলে।
এসময় তার পিতার আর্থিক স্বচ্ছলতা কমতে থাকে। রুহুল আমিনকে এবার জীবিকা নিয়ে
ভাবতে হয়। হাইস্কুল পাশ করে ১৯৫৩ সালে তিনি নৌ বাহিনীতে জুনিয়ার
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য গমন
করেন করাচীর অদূরে মানোরা দ্বীপে পি. এন. এস. কারসাজ-এ (নৌ বাহিনীর কারিগরী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)। ১৯৫৮ সালে তিনি সফলভাবে পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। সফলভাবে কোর্স
সমাপনান্তে তিনি ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি পি.
এন. এস. বখতিয়ার নৌ-ঘাটি, চট্টগ্রামে বদলি হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারের মায়া ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ
দেবার সিদ্ধান্ত নেন এবং এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং
সেক্টরে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বহু সম্মুখ যুদ্ধে অংশ
নেন। সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এ বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর
থেকে প্রাক্তন নৌসেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌ বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো
গঠন করা হয়। পরে তাদের কোলকাতায় আনা হয়। সেখানে সবার সাথে রুহুল আমিনও
ছিলেন।
ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌ বাহিনীকে দুইটি টাগবোট উপহার দেয়। এগুলোকে কোলকাতার
গার্ডেনরীচ নৌ ওয়ার্কসপে দুইটি বাফার গান ও মাইন পড লাগিয়ে গানবোটে
রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় 'পদ্মা' ও 'পলাশ'। রুহুল
আমিন নিয়োগ পান 'পলাশের' ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার হিসেবে। ৬ই ডিসেম্বর মংলা
বন্দরে পাকিস্তানী নৌ ঘাটি পি. এন. এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে 'পদ্মা',
'পলাশ' ও মিত্র বাহিনীর গানবোট 'পানভেল' ভারতের হলদিয়া নৌ ঘাটি থেকে রওনা
হয়। ৮ই ডিসেম্বর সুন্দরবনের আড়াই বানকিতে বিএসএফের পেট্রোল ক্রাফট
'চিত্রাঙ্গদা' তাদের বহরে যোগ দেয়। ৯ই ডিসেম্বর কোন বাধা ছাড়াই তারা হিরণ
পয়েন্টে প্রবেশ করেন। পরদিন ১০ই ডিসেম্বর ভোর ৪টায় তারা মংলা বন্দরের
উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকাল ৭টায় কোন বাধা ছাড়াই তারা মংলায় পৌছান। পেট্রোল
ক্রাফট চিত্রাঙ্গদা মংলাতেই অবস্থান নেয় এবং পানভেল, পদ্মা ও পলাশ সামনে
অগ্রসর হওয়া আরম্ভ করে। দুপুর ১২টায় তারা খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি
পৌঁছান। এমন সময় তাদের অনেক উপরে তিনটি জঙ্গি বিমান দেখা যায়। পদ্মা-পলাশ
থেকে বিমানের উপর গুলিবর্ষণ করার অনুমতি চাইলে বহরের কমান্ডার বিমানগুলো
ভারতীয় বলে জানান। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বিমানগুলো পদ্মা ও পলাশের উপর
গুলি ও ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। পলাশের কমান্ডার সবাইকে গানবোট ত্যাগ করার
নির্দেশ দেন। কিন্তু রুহুল আমিন পলাশেই অবস্থান নেন এবং আপ্রান চেষ্টা
চালান গানবোটকে সচল রাখতে। হঠাৎ একটি গোলা পলাশের ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে এবং
তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ মুহুর্তে রুহুল আমিন নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং আহত
অবস্থায় কোনক্রমে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে পাড়ে অবস্থানরত
পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকাররা তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করে। পরে
তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি
তবে
পারিবারিক ও অন্যান্য সূত্রমতে- বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের লাশ তিন দিন
নদীরপাড়ে পড়ে ছিল। তারপর খুলনা জেলার রূপসা থানার বাঘমারা গ্রামের হৃদয়বান
ব্যক্তি জনাব আবদুল গাফ্ফার গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পূর্ব রূপসার চরে
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনকে কবরস্থ করেন। দীর্ঘ ২৪ বৎসর পর ১৯৯৪ সালে "রূপসা
রিপোর্টাস ক্লাবের" পক্ষ থেকে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের কবরকে সংরক্ষণ ও
রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রতি বছর রূপসা রিপোর্টাস ক্লাব এই
বীরশ্রেষ্ঠকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করে থাকেন।
উপজেলা সোনাইমুড়ীর কলেজ গেট থেকে সি.এন.জি অথবা অটো-রিক্সায় রুহুল আমিন সড়ক দিয়ে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নান্দিয়াপাড়া পূর্ব বাজার এসে দক্ষিনে তাকালেই ২০০গজ দুরে দেখা যায় এই স্মৃতি জাদুঘর ও বীরশ্রেষ্ঠের বাড়ি।
Comments
Post a Comment