নিয়মিত বই পড়ুন এবং সমাজ থেকে অসহনশীলতা দূর করুন
আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই তুলনায় বই পড়া মানুষের সংখ্যা তেমন বাড়েনি। এ দারুণ হতাশাব্যঞ্জক। এদেশে জেলায় জেলায় গণগ্রন্থাগার রয়েছে। এসব গণগ্রন্থাগারের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। একদিকে চুরি হওয়ার ফলে বইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক পুরনো মূল্যবান বইও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আমরা হারাচ্ছি মণিমাণিক্যের চেয়েও মূল্যবান সম্পদ। আমার জানা মতে, দেশের পুরনো কলেজগুলোর গ্রন্থাগারেও অনেক পুরনো মূল্যবান বই আছে; কিন্তু যত্নের অভাবে সেগুলো বিলুপ্তপ্রায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি হিসেবে কাজ করার সময় আমি প্রস্তাব রেখেছিলাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত কলেজগুলোর লাইব্রেরিতে থাকা মূল্যবান বইগুলোর একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হোক। সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রস্তাব ছিল, এই বইগুলো ফটোকপি করে অন্তত একটি বা দুটি কপি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা হোক। বইপ্রেমী না হলে তো কাউকে দিয়ে এই কাজ করানো সম্ভব নয়। মনে হতে পারে একজন প্রোভিসি হিসেবে আমি অনেক কিছু করতে পারতাম; কিন্তু বাস্তব অবস্থা তেমন ছিল না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ভিসি সব ক্ষমতার মালিক ছিলেন। তাই আমার পক্ষে আর বেশিদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না।
ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা ‘মা’ উপন্যাসটি রাশিয়ার জার শাসকদের পছন্দসই না হলেও রাশিয়ার বিপ্লবী যুগের অগণিত পাঠক বইটি পড়ে বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছে। জারদের শাসনামলে মার্কসবাদী বইপত্র নিষিদ্ধ ছিল। তদসত্ত্বেও মার্কসবাদের চর্চা থামিয়ে রাখা যায়নি। এসব বই পড়ার জন্য রাশিয়ায় গড়ে উঠেছিল শত সহস্র পাঠচক্র। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময় এই পার্টির গোপন মুখপত্র ‘শিক্ষা’ পড়ার জন্য অনেক বিপ্লবী তরুণ উন্মুখ হয়ে থাকত। এছাড়া মার্কসবাদী বই পড়ার জন্য গোপন পাঠচক্র গঠিত হয়েছিল। গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য পুরুষ। দল হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি খুব বড় না হলেও একে পাকিস্তানি শাসকরা শ্যেনদৃষ্টিতে রাখত। কারণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার বেশ শক্তি ছিল এই দলটির। সংখ্যায় বড় না হলেও এর ভাবাদর্শগত বাণী অনেকের মধ্যেই সংক্রমিত হয়েছিল। এখন আর এই পার্টি নিষিদ্ধ নয়। তাই একে ঘিরে রোমাঞ্চও তেমন লক্ষ্য করা যায় না। একটি প্রকাশ্য দল হিসেবে এই দলকে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে সাড়া জাগাতে অনেক দূর যেতে হবে, হয়তো অপেক্ষা করতে হবে অনেক সময়।
জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘হে প্রভু তুমি আমার হায়াত বাড়িয়ে দাও, যাতে আমি আরও বই পড়তে পারি।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উদ্ধৃতিযোগ্য অনেক বক্তব্যের সঙ্গে আমার পরিচিতি ঘটেছে; কিন্তু তার এই বক্তব্যটি সবচেয়ে মূল্যবান মনে হয়েছে। মানুষ যদি নিছক দীর্ঘায়ু লাভের জন্য দীর্ঘায়ু কামনা করে, তাহলে ব্যাপারটি হবে খুবই নিরর্থক। কিন্তু বই পড়ার মতো মহান ব্রত পালনের জন্য কেউ যদি দীর্ঘায়ু কামনা করে, তাহলে সে শুধু নিজেকেই আলোকিত করবে না, আলোকিত করবে আরও হাজারও মানুষকে। জ্ঞানের আলোর এই বিচ্ছুরণ একটি মহৎ সমাজ গড়ার পথে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। দার্শনিক সক্রেটিস কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি; কিন্তু তিনি তার অনুসারীদের কাছে অনেক মহৎ ও তাৎপর্যময় বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এগুলো তার শিষ্যরা সংরক্ষণ করেছে। সেগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস নিশ্চয়ই অনেক বই পড়তেন। সৃষ্টিকর্তা তাকে যে মেধা দিয়েছিল সে মেধা শত সহস্র গুণ শানিত হয়েছে বই পড়ার ফলে। তিনি বলতেন, ‘An Unexamined life is not worth living’ অর্থাৎ জিজ্ঞাসাহীন জীবনযাপনে কোনো সার্থকতা নেই। মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা যেমন একটি স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দীপক, তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে জীবন-জিজ্ঞাসা আরও শানিত, আরও উদ্দীপিত হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে সঙ্গীত, নাটক ও নৃত্যকলার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। হওয়া উচিতও। কিন্তু বই পড়া যে, সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, এটা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। বেসরকারি মোবাইল কোম্পানিগুলো এবং ব্যবসা কোম্পানিগুলো যত উদারভাবে নৃত্য-গীতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্পন্সর করে, সেই তুলনায় বই পড়াকে উৎসাহিত করা এবং গ্রন্থাগারে বইয়ের সংগ্রহ যোগ করার ব্যাপারে তারা অনুমাত্র উৎসাহী নয়। এ ধরনের সংকীর্ণ সংস্কৃতি চিন্তা পরিহার করতে হবে। সরকারের গ্রন্থাগারগুলোকে সমৃদ্ধ করার জন্য অর্থ বরাদ্দ বহুগুণে বৃদ্ধি করতে হবে। বই সংগ্রহের নামে রাজনৈতিক স্তাবকদের লেখা বইগুলো সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। দেশের বইপ্রেমীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখার বই সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এদেশে যেন ইউএস লাইব্রেরি অব কংগ্রেস অথবা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মতো গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো খাতে আমরা অনেক অর্থ বিনিয়োগ করছি। কিন্তু রাস্তাঘাট, ব্রিজের মতো অবকাঠামোর চেয়েও জ্ঞানের অবকাঠামো সৃষ্টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকারের লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ১ হাজার কি ২ হাজার কোটি টাকা গ্রন্থাগার সংরক্ষণে বরাদ্দ করা হলে দেশ অনেক বেশি এগিয়ে যেত। রাজনীতিতে অসহনশীলতার যে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে বই পড়ার মাধ্যমে তা-ও স্তিমিত হয়ে আসত।
বই থাকাটাই যথেষ্ট নয়, বই পড়ার মতো মানুষও থাকা প্রয়োজন। এই কাজটি শুরু হতে পারে স্কুলপর্যায় থেকে। আমি ও আমার সহপাঠীরা যখন কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়তাম, তখন সেই স্কুলে বেশ কিছুসংখ্যক জ্ঞানপিপাসু শিক্ষকও ছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক মরহুম ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুর রহমান আমাদের সিন্ধু সভ্যতা পড়াতে গিয়ে নেহেরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’, স্যার মার্টিমোর হুইলার-এর বই এবং রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই পড়তে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি ইতিহাসের আরও অনেক মূল্যবান গ্রন্থ পাঠ করতেও উৎসাহিত করেছিলেন। আমরাও পড়ার চেষ্টা করেছি। ইংরেজিতে লেখা বইগুলো পড়তে ও বুঝতে কষ্ট হয়নি। একইভাবে সাহিত্য ও ভূগলের শিক্ষকরাও পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্যান্য রেফারেন্স বই পড়তে উৎসাহিত করেছেন। তাই আজ আমি বলতে পারি, এসব শিক্ষককে পেয়ে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে আমি ও আমার সহপাঠীরা প্রভূতভাবে উপকৃত হয়েছি। শুধু রেফারেন্স বই-ই নয়, সাহিত্যের বইও পড়তে তারা আমাদের উৎসাহিত করতেন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বই পড়া আন্দোলন আরও ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, প্রতিটি উপজেলায় সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, প্রতিটি বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, জাতীয় পর্যায়ে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের মতো লাইব্রেরি গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এবং সর্বোপরি বই পড়ায় উৎসাহিত করতে উন্নত জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকমণ্ডলী।
গণচীনের এই সময়ের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের পেছনে রয়েছে তাদের কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা। চীনকে সিভিলাইজেশনাল স্টেট বলা হয়। প্রাচীন চীনের একজন জ্ঞানপিপাসুর সাধনা ও অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত দিয়ে এই লেখাটির ইতি টানব। সুন জিং হান ডাইনেস্টির সময় জীবিত ছিলেন। তিনি পড়ার সময় নিদ্রা নিবারণ করতে তার মাথার চুল রশি দিয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। দীর্ঘক্ষণ পড়ার জন্য তিনি কি কষ্টই না সহ্য করেছেন। একই ধরনের গল্প আছে কনফুসিয়াস, সু কিন, কুয়াং হেং, চে ইন এবং সুন কাং সম্পর্কে। বই পড়া ও জ্ঞান চর্চার এমন দৃষ্টান্ত বিরল। গ্রিক দার্শনিক ডায়জেনিস চষধরহ ষরারহম, ধহফ যরময ঃযরহশরহম- এ বিশ্বাস করতেন। জীবনযাত্রা হবে সহজ সরল, চিন্তা হবে উঁচু। তিনি একটি মট্কার মধ্যে দিন যাপন করতেন। এরই ভেতর মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতেন। সময়ে সময়ে মটকার মুখ দিয়ে মাথা উঁচু করে তিনি জ্ঞান ও দর্শনের কথা সাধারণের মধ্যে প্রচার করতেন। এ রকম জ্ঞান সাধকরা না থাকলে আমরা পেতাম না গ্রিক সভ্যতা। মহান জ্ঞান সাধকদের সম্পর্কে গল্প বলে স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বই পড়া ও জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করতে পারেন। ডিজিটাল যুগে তথ্য আহরণ অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের প্রচেষ্টা তেমন সফল হয়নি। কাগজে মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প অন্য কিছু তেমন গভীর ছাপ রাখতে পারে না। কেউ কেউ ই-রিডারের কথা বলবেন। কিন্তু এই যন্ত্রটি কতটা পাঠকবান্ধব, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। তাই বলব বই হোক আমাদের নিত্যসঙ্গী।
Comments
Post a Comment